লিটল ম্যাগাজিন আর ব্যবসা এক সঙ্গে হয় না || আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী তিনি। একদিকে বিশিষ্ট লেখক, অন্যদিকে কণ্ঠস্বর সম্পাদক ও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা। ইত্তেফাক সাময়িকীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারে লিটল ম্যাগাজিন প্রসঙ্গ ছাড়াও সমকালীন সাহিত্যচর্চার প্রবণতা ও সাহিত্য পত্রিকা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-আশফাকুর রহমান
ইত্তেফাক সাময়িকী : লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য আপনি কীভাবে শনাক্ত করেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : লিটলম্যাগের একটা সংজ্ঞা আছে। লিটলম্যাগ ছোট পত্রিকা। তার মানে, সব সময় যে এর কলেবের ছোট হবে তা নয়। তবে সাধারণত এ ছোট হয়। অনেক সময় বড়ও হতে পারে। ছোট হওয়ার কারণ হচ্ছে, এই পত্রিকা যারা বের করে তারা সাহিত্যে নতুন পা রাখতে যাচ্ছে। তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি নেই, সামর্থ নেই, কিন্তু পিপাসা আছে। একটা বড় সাহিত্যের স্বপ্ন তাদের চোখের সামনে। একটা উচ্চতর সাহিত্য যুগের জন্য তারা সংগ্রাম করছে। সে জন্য একটি দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক পত্রিকার যে আর্থিক ভিত্তি থেকে, যে স্বচ্ছলতা থাকে, যে ব্যবসা থাকে তা থেকে লিটলম্যাগ সম্পূর্ণ আলাদা। এ ব্যবসাহীন পত্রিকা। লিটল ম্যাগাজিন আর ব্যবসা এক সঙ্গে হয় না। সাহিত্যের জন্য নিবেদিত কিছু মানুষের শ্রম, আত্মোৎসর্গ এবং স্বপ্ন এর মূল চালিকা শক্তি। অসম্ভব কষ্টের মধ্য দিয়ে এই পত্রিকা বের হয়। যেহেতু এই পত্রিকার কোন প্রচার নেই, সার্কুলেশন নেই, অনেক পাঠক নেই, তাই এর বিজ্ঞাপনও নেই। যেসব বিজ্ঞাপনই এতে পাওয়া যায় তা আসে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে। কিন্তু সেরকম সম্পর্ক একজন তরুণ লেখক বা লেখিকার কতটুকুইবা থাকতে পারে? সেজন্য একটি অসীম দারিদ্রের মধ্য দিয়ে লিটল ম্যাগাজিন বেঁচে থাকে, এগোয়। কিন্তু আপোষহীন-অপরাজিত স্বপ্ন আর শক্তি নিয়ে তারা এ কাজটা করে।
এই ধরনের সব পত্রিকার একজন দুজন মানুষই মূল নিয়ন্ত্রক। তারা একই সঙ্গে সব কাজ করে। তারা লেখা সংগ্রহ করে। নিজেরা লেখে। লেখকদের সংঘবদ্ধ করে। তারা বিভিন্নজনের কাছ থেকে লেখা আনে। সব লেখা সংগ্রহের কষ্ট, বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কষ্ট, পত্রিকা ছাপার কষ্ট, পত্রিকা পাঠকের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়ার কষ্ট, বিজ্ঞাপনের টাকা না পাওয়ার কষ্ট, অনেক সময় পত্রিকা-বিক্রির টাকা না পাওয়ার কষ্ট—সবই তাদের বহন করতে হয়।
তাহলে লিটল ম্যাগাজিনের অবদান কী? এই পত্রিকার স্বপ্ন কী? দেখা যায়, বড় পত্রিকার চেয়ে লিটল ম্যাগাজিনের অবদান অনেক বেশি। অন্তত সাহিত্যের অঙ্গনে। লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে সাহিত্যের নতুন চিন্তা, নতুন সাহিত্যের দল, নতুন সাহিত্যের ধারা সাহিত্যের ক্ষেত্রে জন্ম নেয়। বড় পত্রিকা এটা পারে না। দৈনিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকা তো পারেই না। সাহিত্যের নতুন বাঁক পরিবর্তন, নতুনদিকে যাত্রা, গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে, প্রতিষ্ঠানকে অস্বীকার করে, নতুন পথে সাহসে সঙ্গে যে যাত্রা সেটা হচ্ছে লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা। এর মধ্যে একটা প্রথা বিরোধিতা আছে, একটা দুঃসাহস আছে, বিদ্রোহ আছে। নতুন অনিশ্চিত পথে সাহিত্যের পদপাত, নিত্য নতুন পালাবদল লিটল ম্যাগাজিনই ঘটায়।
ইত্তেফাক সাময়িকী : যুগ যুগ ধরে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে সংঘবদ্ধভাবে কিছু করার প্রয়াস এক্ষেত্রে দেখা যায়...
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : লিটল ম্যাগাজিন সংঘবদ্ধ কিন্তু অসংগঠিত। সংঘবদ্ধ কেননা প্রতিটি লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গেই থাকে একটি করে উদ্দীপ্ত তরুণ লেখক দল যারা সংঘবদ্ধ, সমবেত আয়োজিত। কিন্তু তারা অসংগঠিত কেননা তারা লেখক, অর্থনৈতিক বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা তাদের অনায়ত্ত। এই নৈরাজ্যই লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণ। এই নৈরাজ্য যদি না থাকতো তাহলে লিটল ম্যাগাজিন একটা সুস্থির, ধৈর্যসম্পন্ন, ভারসাম্যময় একটা গতানুগতিক পত্রিকা হয়ে যেত। তার অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা আর অস্থিরতাই তাকে শক্তিশালী করে তোলে।
ইত্তেফাক সাময়িকী : বাংলা ভাষা বা বাংলা সাহিত্যকে লিটল ম্যাগাজিন নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন চর্চার ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গেও সংযুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গটি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : এক একটা যুগ এক একটা নতুন প্রবণতা নতুন স্বপ্ন নিয়ে আসে। সে প্রবণতাকে যারা প্রথম অনুভব করে এবং উৎকর্ণ হয়, তারাই লিটল ম্যাগাজিনের জনক। নতুন যুগ তার নতুন ভাষায় কথা বলতে চায়। সেই ভাষাটা যারা দেয়, তারাই হচ্ছে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক। নতুন যুগ এসে দাঁড়ায় নতুন বাস্তবতা নিয়ে, তার নতুন স্বপ্ন, নতুন মূল্যবোধ বা মূল্যবোধের পতন নিয়ে। লিটল ম্যাগাজিন সেই সব নবাস্বাদিত আবেগ, উদ্দীপনা, শিহরণ আর রোমাঞ্চের কথকথা।
ইত্তেফাক সাময়িকী : বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি কীভাবে ঘটেছে?
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ : ষাটের দশকে আমরা লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন করেছি। একটা সুস্পষ্টতাও এসেছে। সবাই এখন জানে, সেই সময়ে তরুণদের সাহিত্যের আন্দোলন কেমন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমরা প্রায় রাষ্ট্রহীন একটা দেশ পেলাম। একটি দেশ ও তার পতাকা পেলেও একটা বিশৃঙ্খল রাষ্ট্র কাঠামো পেলাম। যে রাষ্ট্রটি অবিকশিত-অসম্পূর্ণ। যার ফলে লুণ্ঠন, দুর্নীতি, মূল্যবোধহীনতা সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করল। সে কারণে সমাজে এলো নৈরাজ্য, অবক্ষয়। পুরনো মধ্যবিত্ত ভেঙ্গে যেতে থাকল। তাদের মূল্যবোধগুলো ধ্বংস হয়ে অনর্জিত অবৈধ বিত্তের ওপর দাঁড়িয়ে একটা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ শুরু হলো। এ নৈরাজ্য পূণ্যের নয় পাপের সন্তান। এই নৈরাজ্য পুরো সময়কে তছনছ করে দিল। ফলে এতকালের সুস্থিত মধ্যবিত্ত টালমাটাল হয়ে ভেঙে পড়ল। তবে এই ধসের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সমাজ ও দেশের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। রাষ্ট্রও একটু একটু সংহত হচ্ছে। সিভিল সোসাইটির উৎকণ্ঠা তৈরি হচ্ছে। আর এসবের পাশাপাশি একটা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী উপরের দিকে উঠে এসেছে। যা একটা ভারসাম্যের দিকে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, আগামী বিশ বছরের মধ্যে আমরা মোটামুটি ভারসাম্যময় মধ্যবিত্ত শ্রেণী পাব। তখন আবার নতুন সাহিত্যের শক্তি নিয়ে লেখকরা উঠে আসবে। এর মাঝখানেও এই যে একটা অরাজক, নৈরাজ্য আক্রান্ত, বিশৃঙ্খল, এ কোনোকিছুকে ভারসাম্যে আসতে দেয়নি। অনেক ভালো ভালো লিটল ম্যাগাজিনও এই সময় এসেছে। কিন্তু ঠিক ঐভাবে দানা বাঁধেনি। লেখকরা এই সময়ে আধা সাহিত্য করেছে, আধা উচ্চতর জীবনের লুব্ধ স্বপ্নে উর্দ্ধশ্বাস হয়েছে। তাই সাহিত্য ব্যাপারে নিষ্ঠা ও একাগ্রতা হোঁচট খেয়েছে। আমাদের সময়ে কিন্তু এমনটা ছিল না। আমরা জানতাম আমাদের জীবন এইখানে বাঁধা। এরপরে কিছু নেই। তাই সাহিত্য সাধনায় পরিপূর্ণ নিবেদন সহজ ছিল। তবে নতুন সময়ের সঙ্গে নতুন যৌবন নতুন লিটল নিয়ে ম্যাগাজিন আসবে, এ অনিবার্য। তবে আর একটি কথা, মানুষের বিত্ত কমে গেলে সে ধ্বংস হয় না, তার নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণেই সে ধ্বংস হয়ে যায়।
ইত্তেফাক সাময়িকী : দেখা যায়, বড় পত্রিকাগুলো লেখকদের তৈরি ও বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলা ভাষাভাষী পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রেও এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আছে...
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : বড় বড় পত্রিকার অনেক ভূমিকা আছে, কিন্তু নবীন লেখকরা ঐ পত্রিকার মাধ্যমে প্রথম লেখা শুরু করেছে এমন উদাহরণ কম। তারা লিটল ম্যাগাজিনে লিখে লিখে যখন সবার চোখে পড়েছে তখনই কেবল বড় পত্রিকা তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ধরনের বড় পত্রিকাকে বলে স্ট্যান্ডার্ড ম্যাগাজিন। কিন্তু তরুণকালের লেখকদের উৎস খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, ওসব পত্রিকা প্রথমেই তাদের লেখা ছাপেনি।
ইত্তেফাক সাময়িকী : কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা কবি জীবনানন্দ দাশের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যেভাবে সাহায্য করেছে তা থেকে তো বলা যায়, এ ধরণের বড় পত্রিকা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছে...
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : কবিতা তো স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা ছিল না, ছিল লিটল ম্যাগাজিন। ওটা ছিল সেকালের নতুন সাহিত্য আন্দোলনের মুখপাত্র। এই পত্রিকার প্রাণই ছিল তরুণরাই। বুদ্ধদেব বসু তখন যৌবনে। ঐ পত্রিকায় যারা লিখতেন তাঁরাও তখন নতুন। পরবর্তী সময়ে যারা এসেছেন, তারাও ছিলেন নতুন। কখনো কখনো বয়সী লেখকদের লেখা কবিতা ছেপেছে। রবীন্দ্রনাথের লেখাও ছেপেছে। কিন্তু তাঁদের আধুনিকতার সগোত্র হলেই লিখেছে, না হলে নয়।
ইত্তেফাক সাময়িক : বাংলাদেশ হওয়ার পর একটি বিষয়ে আমরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করি-সাহিত্যের ক্ষেত্রে, রুচির ক্ষেত্রে, ধারণার ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনসহ অন্যান্য বিষয় বহুভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। এছাড়া বিশেষত, গোষ্ঠীগত বা দলগত অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু চিন্তা-চেতনার কোনো ঐক্য পরিলক্ষিত হয় না। কেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : বহুমাত্রিক লিটল ম্যাগাজিনের প্রাণ। একমাত্রিক স্ট্যান্ডার্ড ম্যাগাজিনের স্বভাব। ‘চতুরঙ্গ’, ‘পরিচয়’ এসব ছিল স্ট্যাডার্ন্ড ম্যাগাজিন। আমাদের এখানে ‘সমকাল’, ‘উত্তরাধিকার’ স্ট্যান্ডার্ড ম্যাগাজিন। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের বহুমাত্রিকতা থাকবেই। আলাদা দল আলাদা ভাষায় নিজ নিজ বিশ্বাসের কথা বলবেই। এই তো লিটল ম্যাগাজিনের বৈশিষ্ট্য। তারা সনাতন থেকেও আলাদা, সমকাল থেকেও আলাদা। তবে তোমার কথাও অনেকটাই ঠিক। দলের সংখ্যা অনেক সময় বাড়াবাড়ি রকমে বেশি। দলীয় আদর্শের জায়গা দখল করেছে বন্ধুত্বচর্চা। সামাজিক মূল্যবোধ তছনছ হয়ে যাওয়ার আদর্শ আর ব্যক্তিস্বার্থের তফাৎ ক্ষীণ হয়ে গেছে।
ইত্তেফাক সাময়িকী : এবার আপনাদের প্রসঙ্গে আসি। আপনার কথা, আপনাদের কথা, কণ্ঠস্বরের কথা আপনি লিখেছেন নানা জায়গায়, নানা বইয়ের। সেই সময়ের দিকে তাকিয়ে এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে তা মূল্যায়ন করবেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : তখন আইয়ুব খানের সামরিক বুটের নিচে আমরা নিপিষ্ট। আমাদের সমস্তরকম সম্ভাবনা অবরুদ্ধ। সারাদেশ তখন একটা অবক্ষয়ের গর্তে নিষ্ক্রিয়। '৭১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনই চলেছে। এই যে মূল্যবোধের সঙ্গে আইয়ুব খান দেশ বিদেশ থেকে নিয়ে আসতে লাগলেন টাকা-বৈদেশিক সাহায্য। এই অনার্জন সুলভ অর্থ অবক্ষয়কে গাঢ়তর করে তুলল। এই অবক্ষয়ই ছিল আমাদের অন্যতম বিষয়। অবক্ষয়ের রোমান্স, অবক্ষয়ের রোমহর্ষকের দপদপে জেল্লা আর কালো অন্ধকার—এসবই ছিল আমাদের উপজীব্য। অবক্ষয়েরও তো একটা রোমান্স আছে, যেমন আছে আশাবাদের। পরে যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে দেশ এগিয়ে যেতে লাগল, সমাজতান্ত্রিক লাল বিপ্লবের স্বপ্ন জেগে উঠল, তখন আস্তে আস্তে আমরা অবক্ষয় থেকে বেরিয়ে এলাম। অন্তত এই চিন্তা প্রক্রিয়া আমাদের সময়ের সব লিটল ম্যাগাজিনগুলোর মধ্যে আছে।
ইত্তেফাক সাময়িকী : এবার একটু ভিন্ন প্রশ্ন। আপনারা যখন লিখতে শুরু করেছেন, তখন কিন্তু ইতোপূর্বে বাংলা সাহিত্যের একটি ঐতিহ্য তৈরি হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে বিদেশী ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে আপনাদের ওতোপ্রোত যোগাযোগ শুরু হয়েছে। এই দুই অভিজ্ঞতা আপনাদের কীভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : বড় একটা ঐতিহ্য আমাদের ছিল, পরে যেটা ভেঙে গেছে। ভেঙে যে গেছে তা আমি বলব না। ঐতিহ্যটা একটু বিপাকে পড়ে আছে। কিন্তু আমরা সেই ঐতিহ্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমরা সেই ঐতিহ্যেরই সন্তান। ঐতিহ্যের ইতিবাচক-নেতিবাচক সবকিছু নিয়েই আমরা কাজ করেছি। আমরা কম্প্রোমাইজ করেনি। কিন্তু পরবর্তীকালে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। একদিকে এসেছে নৈরাজ্য, পাশাপাশি এসেছে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি। যার শক্তি ছিল, সেই কম্প্রোমাইজ করেছে। কিন্তু শক্তিমান মানুষের কম্প্রোমাইজের ঘটনা আমাদের সময়ে খুব কম। অন্তত সাহিত্য জগতে এটা বেশি হয়নি। কারণ আমরা গড়ে উঠেছিলাম একটা সুস্থিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে, একটা নির্দিষ্ট মূল্যবোধের ভেতর থেকে সেই জন্য আমাদের ভাষার মধ্যে, আমাদের চিন্তার মধ্যে, আমাদের শিল্পের কর্মের মধ্যে একটা সংহতি বা ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত আমরা দেখি।
ইত্তেফাক সাময়িকী : কিন্তু নৈরাশ্যবাদীতাও আছে...
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : নৈরাশ্যবাদিতাও আছে। কিন্তু নৈরাশ্যবাদের কারণে একেবারে শুয়ে পড়লাম এটা হয়নি। তাছাড়া নৈরাশ্যবাদকে শিল্পে উত্তীর্ণ করানোর সাফল্যও আমাদের মধ্যে ছিল।
ইত্তেফাক সাময়িকী : বাংলাদেশ হওয়ার পরে যে রাজনৈতিক, সামাজিক, গণতান্ত্রিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ গিয়েছে ও যাচ্ছেÑএই পরিস্থিতির মধ্যেও লেখক সাহিত্যিকরা তাদের সময়ের ছাপ ধরে রাখার দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি লিটল ম্যাগাজিনগুলো উল্লেখিত ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। যার ফলে আপনাদের সময়ের সঙ্গে এই সময়ের একটা সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়...
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : সম্পর্ক আছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের শক্তিমান লেখকরা সবাই প্রায় আমাদের সময়ের। এটা একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। চল্লিশ বছরে এদেশে অনেক প্রতিভাবান মানুষ ছিল। অনেকের মধ্যে সময়ের বৈরিতা তাদের প্রতিভার পূর্ণায়ত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিকশিত যেমন শহীদুল জহিরের মতো এই সময়ের খুব অল্প লেখকই সাহিত্যে পুরোপুরি নিমগ্ন হতে পেরেছেন বা বিশুদ্ধ শিল্পসিদ্ধিতে পৌঁছেছেন। আহমাদ মোস্তফা কামাল, বা জাকির তালুকদার, আনিসুল হক—তাদের লেখার আমি খুব ভক্ত। আরো আছেন অনেকে। কবিতায় আমার প্রিয় একজন কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, তার লেখা আমার খুবই ভালো লাগে। কিন্তু একটা উর্বর সাহিত্যযুগ কি আরও অনেক সম্পন্ন লেখক দাবি করে না? তাছাড়া আশির দশকের লেখক, নব্বই দশকের লেখক, এখনকার লেখকদের সেই শক্তি, সংঘবদ্ধতা বা সেই যুথবদ্ধতা কোথায়, যা ছিল আমাদের সময়ে। অনেকেই কেমন যেন বিচ্ছিন্ন আর একা। বালুর মতো আলাদা আর অসহায় হয়ে রয়েছে। মনে হয়, এমন একটা সময়ের বিরুদ্ধতা বা দুঃসময়ের আক্রমণে তাদের বিস্রস্ত হতে হচ্ছে যতটা বৈরী পরিস্থিতি আমাদের সময়ে ছিল না।
ইত্তেফাক সাময়িকী : এখন দৈনিক পত্রিকাগুলো সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করে থাকে। যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠিত কাগজ ও ব্যবসায়িক কাগজের সমতুল্য। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত কাগজের ভূমিকা সাহিত্য ক্ষেত্রে কী রকম মনে হয়েছে আপনার?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : প্রতিষ্ঠিত কাগজ মানেই কিন্তু সব সময় ব্যবসায়িক কাগজ না। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ প্রতিষ্ঠিত কাগজ, কিন্তু ব্যবসায়িক কাগজ ছিল না। ‘চতুরঙ্গ’ও একই রকম। এরকম অনেক পত্রিকা পাওয়া যায় যেগুলো প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু ব্যবসায়িক নয়, তাদের সাহিত্যমানের কারণে। প্রতিষ্ঠিত কাগজ বাংলাদেশে নেই। ‘দেশ’-এর মতো একটা কাগজ হয়তো ‘কালি ও কলম’, কিন্তু এই কাগজ কি সেই মানদণ্ড দিতে পেরেছে? এর পেছনে কোনো সিরিয়াস সাহিত্য লক্ষ্য নেই। কিছু ভালো লেখা বিভিন্ন জায়গা থেকে জোগাড় করে একসঙ্গে একটা ঠোঙ্গায় করে আমি পরিবেশন করলাম, কিন্তু এটার স্পষ্ট শক্তি, সাহিত্য শক্তি, সাহিত্য স্বপ্ন সেটা তো ওইভাবে নেই। এগুলো বরং লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে আছে অনেক বেশি।
ইত্তেফাক সাময়িকী : শেষ প্রশ্ন। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে এবং আপনি নিজেও হয়তো সেটা লক্ষ্য করেছেন-একজন লেখক নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে, নিজের লেখা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে নিজেই দায়িত্ব নিচ্ছেন। এজন্য সে অনলাইনে বিভিন্ন ব্লগ, সামাজিক সম্পর্ক তৈরির ওয়েবসাইট ব্যবহার করছে। এছাড়াও অনলাইনে সাহিত্য চর্চার বিভিন্ন ওয়েবসাইট তৈরি হয়েছে। ফলে একজন লেখক কিন্তু লিটল ম্যাগাজিন, প্রতিষ্ঠিত কাগজ, ব্যবসায়িক কাগজ ছাপিয়ে নিজেই সবার সামনে উন্মুক্ত হচ্ছে। একজন লেখকের এইদিকে যাত্রার বিষয়টি সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ : এইদিকে যাত্রার বিষয়টি আমি খুব ভালো মনে করি। কিন্তু ওয়েবসাইট শেষ পর্যন্ত একটা উচ্চ শ্রেণীর বিনোদন। একজন শিল্পীর যে সংহত যাত্রা, যে আত্মনিমগ্নতা থাকে, যে অনমনীয় রক্তাক্ত পথে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে, এগুলোর মধ্যে ঠিক সেই অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব না। একজন বড় বা শক্তিমান মানুষের যে কাজ সেটা ওই আধা-হালকা, লঘু, রম্য অবস্থার ভেতর উৎঘাটন সম্ভব না। আর যদি হয়ও, হোক না। সেখান থেকে যদি কিছু আসে আসুক। আমাকে অনেক সময় অনেকে বলে, এখন তো বইয়ের যুগ আর নেই। এখনতো কম্পিউটার-টেলিভিশনের যুগ। আমি বলি, ব্যাপারটা ঠিক এরকম না। এক সময় যখন মানুষ পাথরে লিখত সেটাও বই ছিল। যখন মাটির ওপর লিখতো, তালপাতার উপর, তাও বই ছিল। যখন কাগজে লিখেছে তখনও বই। আর যখন ইন্টারনেটে লিখছে তখনও সেটা বই। এটা বই ছাড়া আর কিছু না। আমরা শুধু মাধ্যমটার পরিবর্তন পাচ্ছি। ফেসবুকের যে জগৎ, এটা একটা রম্য জগৎ। এটি পরস্পরের জন্য আনন্দ, বিনোদন, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে তৈরি হয়েছে। কিন্তু লেখালেখির ক্ষেত্রে ছাপা ফর্মটি শেষ পর্যন্ত খুব সুসংহত ক্ষেত্র। এটার একটা স্থায়ী রূপ আছে। এটা এত ভার্চুয়াল না। ভার্চুয়াল জগৎ একটি ক্ষণস্থায়ী বিষয়। কিন্তু ছাপা আকৃতির একটা স্থায়িত্ব আছে। নতুবা টেলিভিশন দেখার পরও মানুষ পরদিন খবরের কাগজ নিয়ে বসে কেন? কারণ ওখানে সে সংবাদেরই অপেক্ষাকৃত একটা স্থায়ী রূপ দেখে। আমার মনে হয়, সব কিছুর মতো ভার্চুয়াল জগৎ থাকবে। ওগুলোর মধ্যে যে রমণীয় পরিবেশ আছে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ছোঁয়ালাগা আনন্দ আছে, সেটাও থাকবে, এর সঙ্গে সাহিত্য চর্চা থাকলে তা বাড়তি পাওনা। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের মতো সিরিয়াস উদ্যোগগুলোতে যেখানে মানুষের শ্রম দেওয়ার কোনো শেষ নেই, কষ্টের কোনো শেষ নেই, সাধনার কোনো শেষ নেই—এগুলো এত সহজে নষ্ট হয়ে যাওয়ার জিনিস নয়।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন