লিটল ম্যাগাজিন চর্চায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম || হাফিজ রশিদ খান
আমাদের এই সময়
পর্যন্ত লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট কাগজ বিষয়ে আমরা যা জেনেছি, তার সংক্ষিপ্ত অথচ
প্রাঞ্জল সারমর্ম হলো― প্রথাবদ্ধতা, সীমাবদ্ধতা, পশ্চাৎমুখিতা, প্রাতিষ্ঠানিকতা
এবং অভ্যস্ত চিন্তাকাঠামোর বিপরীতে নতুন চিন্তন ও কর্মক্রিয়ার শাণিত কিন্তু
নান্দনিক উপস্থাপন। অথবা এও বলা যায়, নতুন প্রজন্মের মধ্যে উদ্ভূত পৃথিবী ও
স্বদেশ-পরিপাশ বিষয়ে জিজ্ঞাসাসমূহকে ইতোমধ্যে গ্রহণযোগ্যতার তকোমা পেয়ে যাওয়া ‘পুরনো’র জায়গায় প্রতিস্থাপনের জন্যে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। আরো সহজ অর্থে, এটিকে
সাংস্কৃতিক লড়াইও বলা চলে। এ লড়াই মানবধর্মের একটি সহজাত প্রবণতা বটে। অতি নগণ্য
প্রাণীস্তর ছেড়ে বুদ্ধিসম্পন্ন (হোমো-সেপিয়েন্স) প্রাণিতে যখন থেকে মানুষের এগিয়ে
চলার সংগ্রামের শুরু। মজার ব্যাপার হলো : প্রকৃতির ওপর অধিকার কিংবা প্রাধান্য
বিস্তারের লড়াইয়ে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী শুধু প্রকৃতিই ছিল না। ছিল অদীক্ষিত ও
অপরিচ্ছন্ন মনোজগতের ভেতর বসবাসরত মানুষেরই আরেক কুপ্রবৃত্তি ও কুৎসিত
প্রবণতাসমূহ। সভ্যতার ক্রম উৎকর্ষ, পরিমার্জন ও ক্রমাগত সৌন্দর্যের সমবায়ে মানুষ
দেখলো, মানব সভ্যতাকে একটি স্থির জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখাটা অপরাধ বটে। সে জন্যে
প্রথমত যৌথ সংগ্রাম কাক্সিক্ষত হলো, দ্বিতীয়ত সে সংগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সুস্থ
বিস্তৃতির জন্যে জ্ঞানের চিত্রণ প্রদর্শন লিখন ও মুদ্রণ দরকারি হয়ে পড়লো। বস্তুত
সে কারণেই মানুষ অবলম্বন করেছে নানা উপায় ও পথ। প্রথমত বিভিন্ন প্রতীক বা মুদ্রায়,
তারপর কঠিনবস্তুর বুকে অঙ্কন― যেমন, শিলালিপি ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ জ্ঞাপন
করেছে তার ভেতর জেগে ওঠা নতুন কোনো বোধ, ভাবনা বা চিন্তনকে। এ কাজটি উন্নত
মস্তিষ্কের ভেতরই ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। দৈহিক ও মানসিক চাহিদাকে সভ্যমতো পর্যায়ে
নিবৃত্তির পর এসেছে জ্ঞাপনের আকাক্সক্ষাটি। এরই উন্নততর রূপ হলো শ্রুতি। একবার
শোনার পর যে কিনা তা দীর্ঘদিন অবিকল ধারণ ও শেষে পরিবেশনে সক্ষম। তাকে তাই দেয়া
হলো উচ্চমর্যাদা। এই শ্রুতি ও শ্রুতিধরপর্ব পেরিয়ে চলে এলো সভ্যতার নতুন যুগ,
মুদ্রণ প্রযুক্তি। ইউরোপে নবজাগরণকালে অনেকগুলো যুগান্তকারী উপাদানের ভেতর এই
মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যা হোক, এর ইতিহাস তল্লাশ
আপাতত আমাদের এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।
লিটল ম্যাগাজিন ধারণাটি কেনো জ্ঞাপক, অভিযাত্রিকসম চঞ্চল ও নতুনত্বের অভিসারী; তার সামান্য প্রোফাইল মানুষের সুদীর্ঘকালীন চলাফেরা থেকে শনাক্ত করতেই বস্তুত এই প্রসঙ্গের অবতারণা। লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনায় প্রথমত দরকার সমচিন্তার সতীর্থদের মধ্যে ঐক্যবোধ, মুদ্রণ ও প্রচার প্রচেষ্টা। পাশাপাশি অবশ্য লিটলম্যাগের ভুবনে চেতনাগত বিভক্তির ইতিহাসও কম বা নতুন নয়। এ ইতিহাস লিটলম্যাগের সতত চলিষ্ণুতার সঙ্গেই বরাবর বহমান। কারণ মানুষের চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাস কখনো স্থবির নয়। বলা উচিত, মানুষের চিন্তার ইতিহাস মানে তো মানুষের এগিয়ে চলারই ইতিহাস। সুতরাং যারা লিটল ম্যাগাজিন করেন, ভালবাসেন, লিটল ম্যাগাজিন পড়েন, এমন কি যারা এক লিটলম্যাগগ্রুপ ভেঙে আরেক লিটলম্যাগগ্রুপ গড়েন, তারা সকলেই আসলে চেতনাম-িত মানুষ। তারা প্রণম্য পূর্বপিতাদের স্থলে নিজেদের নতুন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সংগ্রামশীল।
এই সংগ্রামে চট্টগ্রামের অবস্থান ব্রাত্য নয়, বরং প্রবর্তনাময় ও সঞ্জীবনী। সেই সুদূরকালের ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি উপনিবেশিতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা এখানে সুচেতা পত্রপত্রিকা প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে দেশজ দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একটি প্রগতিমুখি পাটাতন তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ কলোনিয়াল উপস্থিতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর ভারতের সমতালে দ্রোহাত্মক রচনাবলির সমবায়ে এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে অনেক জাগর পত্রপত্রিকা। বলে রাখা ভালো, ওই সময়ের প্রকাশনাগুলো দৃশ্যত ও অন্তর্গত দিক দিয়ে শিল্পসাহিত্যের ব্রতে কেবলমাত্র সৌন্দর্য-অন্বেষী ছিল, তা নয়। এ কাগজগুলোর অভীষ্ট ছিল জণমনে সুপ্ত অবস্থায় থাকা স্বদেশ ও স্বজাতিচেতনাকে জাগিয়ে তোলা। বিদেশি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা। এ রকম কয়েকটি কাগজের নাম : সত্যবার্তা, দেশপ্রিয়, কোহিনূর, সাধনা, পূরবী, উদয়ন, অধিকার। পত্রিকাগুলো এ অঞ্চলের বাংলাভাষি মানুষের মধ্যে জীবনমুখি চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানি উপনিবেশিককালের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ‘সীমান্ত’ ও ‘প্রাচী’ ছিল উজ্জ্বল দুটো পত্রিকা। সীমান্ত-এর দুই সম্পাদক মাহবুব-উল আলম চৌধুরী ও সুচরিত চৌধুরী সেকালের রাষ্ট্রিক সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক কূপম-ুকতা ও অচলতার বিরুদ্ধে তাদের অক্লান্ত কলম ও কলাম লড়াই চালিয়ে গেছেন। এই ধারার উত্তরাধিকার বহন করে এবং নিজেদের কিছু স্বাতন্ত্র্য মুদ্রিত করার লক্ষে পরিবর্তিকালে প্রকাশিত হলো কিছু তারুণ্যখচিত পত্রপত্রিকা। যেমন : কলরোল, ঐতিহ্য, পদাতিক, পরিপ্রেক্ষিত ইত্যাদি। ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির রবীন্দ্রবিরোধিতার সূত্রে প্রকাশিত হলো মাহবুবুল হকের সম্পাদনায় ‘রবিকরে কবিকণ্ঠ’ নামে প্রতিবাদপত্র। বিষয়টা ছিল এই : উপনিবেশিক শাসকমহল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে বিধৃত বিভিন্নমুখি মানবিক স্ফূর্তি ও বাঙালি জীবনের বিভিন্ন আর্তি ও আবেদনগুলোতে তার হিন্দুধর্মীয় নাম-অঙ্কিত থাকায় সেগুলোকে হিন্দুয়ানি বলে খারিজ করে দিতে উদ্যোগী হয়। এবং সেভাবে রাষ্ট্রিক পর্যায়ে প্রচারণায় নেমে পড়ে। এর অন্তর্নিহিত সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে বাংলাভাষি এদেশের বদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে উত্থিত হলো জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। তারা রবীন্দ্রসাহিত্যের মানবতাবাদী ও বাঙালি ধারাকে গুরুত্ব দিলেন। এভাবে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের আওতায় বাঙালির সর্বাত্মক আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ও পরবর্তিকালের মহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসনকাল অপসৃত হলো ১৯৭১ সালে। অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতাসহ পৃথিবীর পরিসরে প্রবেশ করল নতুন দশকে। সার্বভৌম ভৌগোলিক বাস্তবতা সত্ত্বেও অব্যবহিত পূর্বকালের উপনিবেশিক জের ও যুগসন্ধিক্ষণের অস্থিরতা তৎকালিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থিত-অবস্থার দিকে পরিণতি পেতে দেয়নি। তাই দশকটির মধ্যভাগে এসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের অপ্রত্যাশিত হত্যাকা- ও সামরিক শাসনের অনুপ্রবেশ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে মাৎস্যন্যায় ও নৈরাজ্যিক প্রতিবেশে নিক্ষেপ করে। সমরশাসনের রাইফেল, বুট আর চোখ রাঙানো পরিস্থিতি কিছুটা সমঝে এলে এটির বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নতুন ইশতেহার নিয়ে রাজপথে উপস্থিত হলো। দেশব্যাপী বিস্তারিত সেই আওয়াজ ও তৎপরতার সমতালে চট্টগ্রামে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে দেখা গেল লিটল ম্যাগাজিন ও বিবিধাত্মক সচেতক প্রচারপত্রের সম্মিলিত পদচারণা। অন্তিম সত্তর দশকে এসে ক্ষমতার সামরিক শাসকগণ কিছু কিছু শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে মনোনিবেশ করলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হতে পারেনি। আশির দশকের প্রথম দিকে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক হত্যাকা- এবং অব্যবহিত স্বল্প সময়ের মধ্যে পুনরায় সামরিক শাসনের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ যেনো পুনরায় পুরাণকথিত রৌরব নরকে নিপতিত হলো। পুরো আশির দশকব্যাপী এই রৌরবে বাংলাদেশ জ্বলতে থাকে তার সমস্ত ঐতিহাসিক অর্জন, মূল্যবোধ ও জাতীয় অভীপ্সাসমূহ নিয়ে। সমরশাসকের উপদেশে চলতে থাকা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রাক্তন উপনিবেশিক শাসনের সরাসরি উপকারভোগিগণের পরিত্যক্ত আড়ম্বরে দুর্বিষহ হয়ে উঠলো বাংলাদেশের নাগরিক বাসোপযোগিতা। দেশের নাগরিক সমাজ ওই অপ্রক্রিয়া ও অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তারই ধারাবাহিকতায় নগর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশ পেতে থাকে প্রতিবাদমুখর লিটল ম্যাগাজিন ও লিটল ম্যাগাজিনের স্বভাবধর্মী যৌথ ও একক প্রচেষ্টার বিভিন্ন পত্রপত্রিকা। এগুলোর মধ্যে ছিল অচিরা; স্পার্ক জেনারেশন; সম্পাদক; এপিটাফ প্রভৃতি।
মধ্য-আশি ও নব্বই দশকে চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিনচর্চা গুণেমানে ও ব্যাপকতায় সমগ্র বাংলাদেশেই চূড়াস্পর্শ করে, সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গক্রমে চট্টগ্রামে ওই সময় প্রবাহের মধ্যে প্রকাশিত লিটলম্যাগসমূহের একটি তালিকা এখানে প্রয়োজনীয় হতে পারে। যেমন : প্রতীতী; অসভ্য শব্দেরা; কবিতা; মনন; লিরিক; স্পর্শ, কিছুদিন রৌদ্রের মুখোমুখি; মূল্যায়ন; লিটল ম্যাগাজিন; সাতসতেরো; তোলপাড়; হৃদপি-; মফস্বল; চর্যা; গল্প; দ্রৌপদী; শব্দের সংসার; দেশকাল; লিটল ম্যাগাজিন; শামা; অব্যয়; অনোমা; প্রসঙ্গ; মৃগয়া; সমস্বর; বহ্নি; প্রেরণা; সুদর্শনচক্র; আর্ট বুলেটিন; আড্ডারু; পুষ্পকরথ; অন্তরীপ; কমব্যাট; নির্মাণ; মধ্যাহ্ন; আপাতত; ঋতপত্র; অটবি; ঋতবাক; অর্কেস্ট্রা; ধ্বনি; চারুকৃৎ, বৃক্ষ; একান্তর; চম্পকনগর; ফলক; বলাকা; মনোভূমি; ১৪০০; কালধারা; এ যাত্রা; মৃত্তিকা; পংক্তিমালা; পরমায়ু; একলব্য; বালুচর; উপমা; জোড়াসাঁকো; বৃষ্টি; চারণ; ধানের শীষে গান; পান্থ; কবিকৃতি; উপবন; যোগসূত্র; উত্তরমেঘ; জলঘড়ি; নোঙর; ঢেউ; উৎকর্ণ; চর্যাপদ; আগুনখোলা; ঘুড়ি; খড়িমাটি; শঙ্খবাস; কঙ্কাল; ওপেন টেক্সট; শাঁখ; চেরাগীআড্ডা; ডাকঘর; ডাক প্রভৃতি। এছাড়াও আরো অনেক লিটলম্যাগীয় চারিত্রসম্পন্ন কাগজের নাম এ তালিকায় সংযুক্ত হতে পারে।
এখন এখানে বিগত ইংরেজি বিশ শতকের আশি ও নব্বই দশকের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। সে গুলো হলো : কিছুদিন রৌদ্রের মুখোমুখি [সম্পাদক : আসাদ মান্নান]; তোলপাড় [সম্পাদক : ইউসুফ মুহম্মদ]; লিরিক [সম্পাদক : এজাজ ইউসুফী]; শামা [সম্পাদক : রাশেদ মাহমুদ]; প্রসঙ্গ [সম্পাদক : আবুল মনসুর, ঢালী আল মামুন ও অন্যান্য; সুদর্শনচক্র [সম্পাদক : সাজিদুল হক]; মধ্যাহ্ন [সম্পাদক : ওমর কায়সার]; অব্যয় [সম্পাদক : সুমন ইসলাম ও আবু তাহের মুহাম্মদ]; মূল্যায়ন [সম্পাদক : অমিত চৌধুরী]; চর্যা [সম্পাদক : সঞ্জীব বড়–য়া]; কালধারা [সম্পাদক : শাহ আলম নিপু; মোহীত উল আলম, নিতাই সেন ও অন্যান্য]; ১৪০০ [সম্পাদক : কামাল রাহমা ]; লুক থ্রু; ইন্টারকাট [সম্পাদক : আনোয়ার হোসেন পিন্টু]; ছড়াপত্রিকা [সম্পাদক : মাহবুবুল হাসান]।
উল্লিখিত কাগজগুলো বিভিন্ন কৌণিকতা ও মাত্রিকতার কারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে চট্টগ্রামের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রচিন্তনে। শুধুমাত্র কবি ও কবিতাবিষয়ক লেখালেখিকে কেন্দ্রে রেখে প্রকাশিত ‘কিছুদিন রৌদ্রের মুখোমুখি’ সে সময় তারুণ্যের ভালোলাগার লিটল ম্যাগাজিন হয়ে উঠেছিল। ‘তোলপাড়’ আশির দশকের প্রথমার্ধে বেশ কয়েকটি ঋদ্ধ সংখ্যা প্রকাশ করে। সম্পাদনা ও মুদ্রণ সৌকর্যে পরিচ্ছন্নতা ও রুচিশীলতার সযতœ ছাপ ছিল এ কাগজে। ‘লিরিক’ আশির দশকের প্রথম থেকে প্রকাশিত হয়ে নব্বই দশকেও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা প্রকাশ করে। উত্তর আধুনিকতাবাদী সাহিত্যভাবনাকে প্রাধান্যদানকারী লিরিক কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা প্রকাশ করে সুধিসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। শামা’র ১৯৮৭-র একটি সংখ্যায় পশ্চিমবাংলার বিশিষ্ট মৌল মানবতাবাদী চিন্তক শিবনারায়ণ রায়-এর ‘নাস্তিকের ধর্ম-জিজ্ঞাসা’ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন অধ্যাপক রশীদ আল ফারুকীর ‘ধর্ম ও রাজনীতি’ প্রবন্ধ দুটো বেশ আবর্ত তৈরি করে সচেতনমহলে। অধ্যাপক ফারুকী সেকালের একনায়ক স্বৈরাচারী এরশাদের অতিমাত্রিক ধর্মপ্রীতি ও তার মাধ্যমে করা রাষ্ট্রিক ও সামাজিক অনাচারের অসংখ্য বিবরণ জীবন্ত ভাষা ও প্রতীকে তুলে ধরেন।
‘প্রসঙ্গ’ উল্লিখিত ছোট কাগজগুলোর ভিড়ে ছিল অনেকটাই পরিণত ও ধীরস্থির চিন্তাভাবনার অনুসারী। তারুণ্যের উৎকণ্ঠা ও চঞ্চলতা প্রসঙ্গ-এর বুকে থিতু হয়ে এনেছিল সাহিত্য, সমালোচনা, শিল্প, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, চারুকলা, প্রভৃতি বিষয়ের ওপর মানসম্পন্ন মুদ্রিত রচনা। ‘সুদর্শনচক্র’ প্রকৃত লিটলম্যাগ স্বভাবের চারিত্র ধারণ করে শুধু লিটলম্যাগেই লেখেন এমন কবি-গল্পকার-প্রাবন্ধিকদের তার পাতায় প্রাধান্য দিয়ে চেতনার দৃঢ়ত্বের পরিচয় রাখতে সক্ষম হয়। ‘মধ্যাহ্ন’ কবিতাকেন্দ্রী ভাবনায় বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করে। কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও তরুণ কবিদের ভাবনা প্রকাশনায় মধ্যাহ্ন কৃতির স্বাক্ষর রাখে। ‘অব্যয়’ আশির দশকে বারোটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা প্রকাশ করে। সৃজনশীল লেখার অপ্রতুলতার সংকটেও কাগজটির সম্পাদনা ও মুদ্রণ পারিপাট্য ছিল রুচিশীল ও আন্তরিকাস্পর্শী। ‘মূল্যায়ন’ সাহিত্যের সবক’টা মাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছে। এর সম্পাদকের বিশেষ কৃতিত্ব চট্টল গবেষক আবদুল হক চৌধুরীকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা, তাঁর মননশীলতাকে একটি সংখ্যার মোড়কে উপস্থাপন। ‘চর্যা’ শুধু নাট্যভাবনাকে কেন্দ্রে রেখে প্রকাশিত হতে থাকে। বেশ কিছু মৌলিক নাটকও এতে মুদ্রিত হয়। ‘কালধারা’র যূথচারিতার পাশাপাশি সমন্বয়ধর্মী একটা চারিত্র লক্ষণীয় ছিল। ‘১৪০০’ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের তরুণ-প্রবীণ লেখকের অনেক নতুন চিন্তার লেখা ছেপেছে। ‘লুক থ্রু’ ও ‘ইন্টারকাট’ রুচি ও মননশীল একাগ্রতায় চলচ্চিত্রবিষয়ক ছোট কাগজ। মুদ্রণ ও অঙ্গসজ্জাগত পারিপাট্যের মধ্যে এর সূচিপত্রের চলচ্চিত্রিক অন্বেষা সে সময় উল্লেখযোগ্য আগ্রহ তৈরি করেছিল। ‘ছড়াপত্রিকা’টি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ছড়াসাহিত্যের ওপর উল্লেখনীয় লিটলম্যাগ। এতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ছড়াচর্চার সাম্প্রতিক প্রবণতার খোঁজ পেতে খুব একটা বেগ পেতে হত না। সম্পাদক এখনও সেই চারিত্র ধরে রাখতে শ্রম ও মেধা যোগ করে চলেছেন।
লিটল ম্যাগাজিন ধারণাটি কেনো জ্ঞাপক, অভিযাত্রিকসম চঞ্চল ও নতুনত্বের অভিসারী; তার সামান্য প্রোফাইল মানুষের সুদীর্ঘকালীন চলাফেরা থেকে শনাক্ত করতেই বস্তুত এই প্রসঙ্গের অবতারণা। লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনায় প্রথমত দরকার সমচিন্তার সতীর্থদের মধ্যে ঐক্যবোধ, মুদ্রণ ও প্রচার প্রচেষ্টা। পাশাপাশি অবশ্য লিটলম্যাগের ভুবনে চেতনাগত বিভক্তির ইতিহাসও কম বা নতুন নয়। এ ইতিহাস লিটলম্যাগের সতত চলিষ্ণুতার সঙ্গেই বরাবর বহমান। কারণ মানুষের চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাস কখনো স্থবির নয়। বলা উচিত, মানুষের চিন্তার ইতিহাস মানে তো মানুষের এগিয়ে চলারই ইতিহাস। সুতরাং যারা লিটল ম্যাগাজিন করেন, ভালবাসেন, লিটল ম্যাগাজিন পড়েন, এমন কি যারা এক লিটলম্যাগগ্রুপ ভেঙে আরেক লিটলম্যাগগ্রুপ গড়েন, তারা সকলেই আসলে চেতনাম-িত মানুষ। তারা প্রণম্য পূর্বপিতাদের স্থলে নিজেদের নতুন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সংগ্রামশীল।
এই সংগ্রামে চট্টগ্রামের অবস্থান ব্রাত্য নয়, বরং প্রবর্তনাময় ও সঞ্জীবনী। সেই সুদূরকালের ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি উপনিবেশিতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা এখানে সুচেতা পত্রপত্রিকা প্রকাশ করেছেন। এর মাধ্যমে দেশজ দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একটি প্রগতিমুখি পাটাতন তৈরি হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ কলোনিয়াল উপস্থিতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর ভারতের সমতালে দ্রোহাত্মক রচনাবলির সমবায়ে এখান থেকে প্রকাশিত হয়েছে অনেক জাগর পত্রপত্রিকা। বলে রাখা ভালো, ওই সময়ের প্রকাশনাগুলো দৃশ্যত ও অন্তর্গত দিক দিয়ে শিল্পসাহিত্যের ব্রতে কেবলমাত্র সৌন্দর্য-অন্বেষী ছিল, তা নয়। এ কাগজগুলোর অভীষ্ট ছিল জণমনে সুপ্ত অবস্থায় থাকা স্বদেশ ও স্বজাতিচেতনাকে জাগিয়ে তোলা। বিদেশি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা। এ রকম কয়েকটি কাগজের নাম : সত্যবার্তা, দেশপ্রিয়, কোহিনূর, সাধনা, পূরবী, উদয়ন, অধিকার। পত্রিকাগুলো এ অঞ্চলের বাংলাভাষি মানুষের মধ্যে জীবনমুখি চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানি উপনিবেশিককালের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ‘সীমান্ত’ ও ‘প্রাচী’ ছিল উজ্জ্বল দুটো পত্রিকা। সীমান্ত-এর দুই সম্পাদক মাহবুব-উল আলম চৌধুরী ও সুচরিত চৌধুরী সেকালের রাষ্ট্রিক সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক কূপম-ুকতা ও অচলতার বিরুদ্ধে তাদের অক্লান্ত কলম ও কলাম লড়াই চালিয়ে গেছেন। এই ধারার উত্তরাধিকার বহন করে এবং নিজেদের কিছু স্বাতন্ত্র্য মুদ্রিত করার লক্ষে পরিবর্তিকালে প্রকাশিত হলো কিছু তারুণ্যখচিত পত্রপত্রিকা। যেমন : কলরোল, ঐতিহ্য, পদাতিক, পরিপ্রেক্ষিত ইত্যাদি। ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির রবীন্দ্রবিরোধিতার সূত্রে প্রকাশিত হলো মাহবুবুল হকের সম্পাদনায় ‘রবিকরে কবিকণ্ঠ’ নামে প্রতিবাদপত্র। বিষয়টা ছিল এই : উপনিবেশিক শাসকমহল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে বিধৃত বিভিন্নমুখি মানবিক স্ফূর্তি ও বাঙালি জীবনের বিভিন্ন আর্তি ও আবেদনগুলোতে তার হিন্দুধর্মীয় নাম-অঙ্কিত থাকায় সেগুলোকে হিন্দুয়ানি বলে খারিজ করে দিতে উদ্যোগী হয়। এবং সেভাবে রাষ্ট্রিক পর্যায়ে প্রচারণায় নেমে পড়ে। এর অন্তর্নিহিত সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে বাংলাভাষি এদেশের বদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে উত্থিত হলো জোরালো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। তারা রবীন্দ্রসাহিত্যের মানবতাবাদী ও বাঙালি ধারাকে গুরুত্ব দিলেন। এভাবে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের আওতায় বাঙালির সর্বাত্মক আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ও পরবর্তিকালের মহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসনকাল অপসৃত হলো ১৯৭১ সালে। অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতাসহ পৃথিবীর পরিসরে প্রবেশ করল নতুন দশকে। সার্বভৌম ভৌগোলিক বাস্তবতা সত্ত্বেও অব্যবহিত পূর্বকালের উপনিবেশিক জের ও যুগসন্ধিক্ষণের অস্থিরতা তৎকালিন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে স্থিত-অবস্থার দিকে পরিণতি পেতে দেয়নি। তাই দশকটির মধ্যভাগে এসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের অপ্রত্যাশিত হত্যাকা- ও সামরিক শাসনের অনুপ্রবেশ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে মাৎস্যন্যায় ও নৈরাজ্যিক প্রতিবেশে নিক্ষেপ করে। সমরশাসনের রাইফেল, বুট আর চোখ রাঙানো পরিস্থিতি কিছুটা সমঝে এলে এটির বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নতুন ইশতেহার নিয়ে রাজপথে উপস্থিত হলো। দেশব্যাপী বিস্তারিত সেই আওয়াজ ও তৎপরতার সমতালে চট্টগ্রামে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে দেখা গেল লিটল ম্যাগাজিন ও বিবিধাত্মক সচেতক প্রচারপত্রের সম্মিলিত পদচারণা। অন্তিম সত্তর দশকে এসে ক্ষমতার সামরিক শাসকগণ কিছু কিছু শাসনতান্ত্রিক সংস্কারে মনোনিবেশ করলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হতে পারেনি। আশির দশকের প্রথম দিকে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক হত্যাকা- এবং অব্যবহিত স্বল্প সময়ের মধ্যে পুনরায় সামরিক শাসনের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ যেনো পুনরায় পুরাণকথিত রৌরব নরকে নিপতিত হলো। পুরো আশির দশকব্যাপী এই রৌরবে বাংলাদেশ জ্বলতে থাকে তার সমস্ত ঐতিহাসিক অর্জন, মূল্যবোধ ও জাতীয় অভীপ্সাসমূহ নিয়ে। সমরশাসকের উপদেশে চলতে থাকা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রাক্তন উপনিবেশিক শাসনের সরাসরি উপকারভোগিগণের পরিত্যক্ত আড়ম্বরে দুর্বিষহ হয়ে উঠলো বাংলাদেশের নাগরিক বাসোপযোগিতা। দেশের নাগরিক সমাজ ওই অপ্রক্রিয়া ও অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। তারই ধারাবাহিকতায় নগর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশ পেতে থাকে প্রতিবাদমুখর লিটল ম্যাগাজিন ও লিটল ম্যাগাজিনের স্বভাবধর্মী যৌথ ও একক প্রচেষ্টার বিভিন্ন পত্রপত্রিকা। এগুলোর মধ্যে ছিল অচিরা; স্পার্ক জেনারেশন; সম্পাদক; এপিটাফ প্রভৃতি।
মধ্য-আশি ও নব্বই দশকে চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিনচর্চা গুণেমানে ও ব্যাপকতায় সমগ্র বাংলাদেশেই চূড়াস্পর্শ করে, সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গক্রমে চট্টগ্রামে ওই সময় প্রবাহের মধ্যে প্রকাশিত লিটলম্যাগসমূহের একটি তালিকা এখানে প্রয়োজনীয় হতে পারে। যেমন : প্রতীতী; অসভ্য শব্দেরা; কবিতা; মনন; লিরিক; স্পর্শ, কিছুদিন রৌদ্রের মুখোমুখি; মূল্যায়ন; লিটল ম্যাগাজিন; সাতসতেরো; তোলপাড়; হৃদপি-; মফস্বল; চর্যা; গল্প; দ্রৌপদী; শব্দের সংসার; দেশকাল; লিটল ম্যাগাজিন; শামা; অব্যয়; অনোমা; প্রসঙ্গ; মৃগয়া; সমস্বর; বহ্নি; প্রেরণা; সুদর্শনচক্র; আর্ট বুলেটিন; আড্ডারু; পুষ্পকরথ; অন্তরীপ; কমব্যাট; নির্মাণ; মধ্যাহ্ন; আপাতত; ঋতপত্র; অটবি; ঋতবাক; অর্কেস্ট্রা; ধ্বনি; চারুকৃৎ, বৃক্ষ; একান্তর; চম্পকনগর; ফলক; বলাকা; মনোভূমি; ১৪০০; কালধারা; এ যাত্রা; মৃত্তিকা; পংক্তিমালা; পরমায়ু; একলব্য; বালুচর; উপমা; জোড়াসাঁকো; বৃষ্টি; চারণ; ধানের শীষে গান; পান্থ; কবিকৃতি; উপবন; যোগসূত্র; উত্তরমেঘ; জলঘড়ি; নোঙর; ঢেউ; উৎকর্ণ; চর্যাপদ; আগুনখোলা; ঘুড়ি; খড়িমাটি; শঙ্খবাস; কঙ্কাল; ওপেন টেক্সট; শাঁখ; চেরাগীআড্ডা; ডাকঘর; ডাক প্রভৃতি। এছাড়াও আরো অনেক লিটলম্যাগীয় চারিত্রসম্পন্ন কাগজের নাম এ তালিকায় সংযুক্ত হতে পারে।
এখন এখানে বিগত ইংরেজি বিশ শতকের আশি ও নব্বই দশকের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যাক। সে গুলো হলো : কিছুদিন রৌদ্রের মুখোমুখি [সম্পাদক : আসাদ মান্নান]; তোলপাড় [সম্পাদক : ইউসুফ মুহম্মদ]; লিরিক [সম্পাদক : এজাজ ইউসুফী]; শামা [সম্পাদক : রাশেদ মাহমুদ]; প্রসঙ্গ [সম্পাদক : আবুল মনসুর, ঢালী আল মামুন ও অন্যান্য; সুদর্শনচক্র [সম্পাদক : সাজিদুল হক]; মধ্যাহ্ন [সম্পাদক : ওমর কায়সার]; অব্যয় [সম্পাদক : সুমন ইসলাম ও আবু তাহের মুহাম্মদ]; মূল্যায়ন [সম্পাদক : অমিত চৌধুরী]; চর্যা [সম্পাদক : সঞ্জীব বড়–য়া]; কালধারা [সম্পাদক : শাহ আলম নিপু; মোহীত উল আলম, নিতাই সেন ও অন্যান্য]; ১৪০০ [সম্পাদক : কামাল রাহমা ]; লুক থ্রু; ইন্টারকাট [সম্পাদক : আনোয়ার হোসেন পিন্টু]; ছড়াপত্রিকা [সম্পাদক : মাহবুবুল হাসান]।
উল্লিখিত কাগজগুলো বিভিন্ন কৌণিকতা ও মাত্রিকতার কারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে চট্টগ্রামের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রচিন্তনে। শুধুমাত্র কবি ও কবিতাবিষয়ক লেখালেখিকে কেন্দ্রে রেখে প্রকাশিত ‘কিছুদিন রৌদ্রের মুখোমুখি’ সে সময় তারুণ্যের ভালোলাগার লিটল ম্যাগাজিন হয়ে উঠেছিল। ‘তোলপাড়’ আশির দশকের প্রথমার্ধে বেশ কয়েকটি ঋদ্ধ সংখ্যা প্রকাশ করে। সম্পাদনা ও মুদ্রণ সৌকর্যে পরিচ্ছন্নতা ও রুচিশীলতার সযতœ ছাপ ছিল এ কাগজে। ‘লিরিক’ আশির দশকের প্রথম থেকে প্রকাশিত হয়ে নব্বই দশকেও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা প্রকাশ করে। উত্তর আধুনিকতাবাদী সাহিত্যভাবনাকে প্রাধান্যদানকারী লিরিক কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা প্রকাশ করে সুধিসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। শামা’র ১৯৮৭-র একটি সংখ্যায় পশ্চিমবাংলার বিশিষ্ট মৌল মানবতাবাদী চিন্তক শিবনারায়ণ রায়-এর ‘নাস্তিকের ধর্ম-জিজ্ঞাসা’ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন অধ্যাপক রশীদ আল ফারুকীর ‘ধর্ম ও রাজনীতি’ প্রবন্ধ দুটো বেশ আবর্ত তৈরি করে সচেতনমহলে। অধ্যাপক ফারুকী সেকালের একনায়ক স্বৈরাচারী এরশাদের অতিমাত্রিক ধর্মপ্রীতি ও তার মাধ্যমে করা রাষ্ট্রিক ও সামাজিক অনাচারের অসংখ্য বিবরণ জীবন্ত ভাষা ও প্রতীকে তুলে ধরেন।
‘প্রসঙ্গ’ উল্লিখিত ছোট কাগজগুলোর ভিড়ে ছিল অনেকটাই পরিণত ও ধীরস্থির চিন্তাভাবনার অনুসারী। তারুণ্যের উৎকণ্ঠা ও চঞ্চলতা প্রসঙ্গ-এর বুকে থিতু হয়ে এনেছিল সাহিত্য, সমালোচনা, শিল্প, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, চারুকলা, প্রভৃতি বিষয়ের ওপর মানসম্পন্ন মুদ্রিত রচনা। ‘সুদর্শনচক্র’ প্রকৃত লিটলম্যাগ স্বভাবের চারিত্র ধারণ করে শুধু লিটলম্যাগেই লেখেন এমন কবি-গল্পকার-প্রাবন্ধিকদের তার পাতায় প্রাধান্য দিয়ে চেতনার দৃঢ়ত্বের পরিচয় রাখতে সক্ষম হয়। ‘মধ্যাহ্ন’ কবিতাকেন্দ্রী ভাবনায় বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করে। কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও তরুণ কবিদের ভাবনা প্রকাশনায় মধ্যাহ্ন কৃতির স্বাক্ষর রাখে। ‘অব্যয়’ আশির দশকে বারোটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা প্রকাশ করে। সৃজনশীল লেখার অপ্রতুলতার সংকটেও কাগজটির সম্পাদনা ও মুদ্রণ পারিপাট্য ছিল রুচিশীল ও আন্তরিকাস্পর্শী। ‘মূল্যায়ন’ সাহিত্যের সবক’টা মাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছে। এর সম্পাদকের বিশেষ কৃতিত্ব চট্টল গবেষক আবদুল হক চৌধুরীকে নিয়ে ভাবনাচিন্তা, তাঁর মননশীলতাকে একটি সংখ্যার মোড়কে উপস্থাপন। ‘চর্যা’ শুধু নাট্যভাবনাকে কেন্দ্রে রেখে প্রকাশিত হতে থাকে। বেশ কিছু মৌলিক নাটকও এতে মুদ্রিত হয়। ‘কালধারা’র যূথচারিতার পাশাপাশি সমন্বয়ধর্মী একটা চারিত্র লক্ষণীয় ছিল। ‘১৪০০’ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের তরুণ-প্রবীণ লেখকের অনেক নতুন চিন্তার লেখা ছেপেছে। ‘লুক থ্রু’ ও ‘ইন্টারকাট’ রুচি ও মননশীল একাগ্রতায় চলচ্চিত্রবিষয়ক ছোট কাগজ। মুদ্রণ ও অঙ্গসজ্জাগত পারিপাট্যের মধ্যে এর সূচিপত্রের চলচ্চিত্রিক অন্বেষা সে সময় উল্লেখযোগ্য আগ্রহ তৈরি করেছিল। ‘ছড়াপত্রিকা’টি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ছড়াসাহিত্যের ওপর উল্লেখনীয় লিটলম্যাগ। এতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ছড়াচর্চার সাম্প্রতিক প্রবণতার খোঁজ পেতে খুব একটা বেগ পেতে হত না। সম্পাদক এখনও সেই চারিত্র ধরে রাখতে শ্রম ও মেধা যোগ করে চলেছেন।
লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশে পার্বত্য চট্টগ্রাম
আমাদের
প্রতিবেশি আদিবাসী সমাজেও শিল্প-সাহিত্যচর্চার প্রতি উৎসাহ-উদ্দীপনা জাগছে অন্য যেকোনো
সময়ের চেয়ে বেশি। তারা মাতৃজবানে তাদের পিতৃপুরুষের স্মৃতিতর্পণ করতে চান। মায়ের
বুলিতে জীবনের অনুকূল-প্রতিকূল সকল বিষয়ে অভিমত-অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে চান। কবিতা
গল্প উপন্যাস ও নানামাত্রিক গদ্যকথায় তাদের মনোদেশকে উদ্ভাসিত করে তুলতে চান
সম্মিলিতভাবে। সেই লক্ষে লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্যপত্র, সাময়িকী প্রকাশনার মাধ্যমে
আদিবাসী সচেতন সাহিত্যশিল্পের সমঝদারগণ যারপরনাই সামাজিক দায়বদ্ধতায় যূথবদ্ধ থাকতে
আগ্রহী।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে বেরিয়েছে-বের হচ্ছে ‘ইরুক’ (সম্পাদক : মৃত্তিকা চাকমা), ‘ক’জলি’ (সম্পাদক : সুসময় চাকমা ও সজীব চাকমা), ‘মাওরুম’ (সম্পাদক : দীপায়ন খীসা), ‘জুম’ (সম্পাদক : নবলেশ্বর দেওয়ান লায়ন, পল্লব চাকমা, জুয়েল চাকমা), ‘জ্বলি যার বুবর বুক’ (সম্পাদক : অনুস্মৃতি চাকমা), ‘টঙ’ (সম্পাদক : রনেল চাকমা), ‘হাজলং’ (সম্পাদক : স্মরণিকা চাকমা), ‘রেগা’ (সম্পাদক : ইন্টুমনি তালুকদার), সমুজ্জ্বল সুবাতাস (সম্পাদক : হাফিজ রশিদ খান ও চৌধুরী বাবুল বড়–য়া), ‘মা ত্রি চা লু মু খি পা খু ব ত’ (সম্পাদক : মুক্তা চাকমা), ‘মো লাং নীং’ (সম্পাদক : বো চ হাই), ‘মোনকধা’ (সম্পাদক : কীর্তিনিশান চাকমা), ‘হিলি ওয়েভস’ (সম্পাদক : সুবারুন চাকমা), ‘ইয়াপ্রি-তিন’ (মলয় কিশোর ত্রিপুরা), ‘স্ববন’ (সম্পাদক : মুকেশ চাকমা), ‘আপেং’ (সম্পাদক : রিপন চাঙমা), ‘রেঙ’ (সম্পাদক : লিটন চাকমা অন্নদা), ‘ত্যেঠা’ (সম্পাদক : উ রাখাইন কায়েস)। এসব সাময়িকপত্র ও ছোটো কাগজ প্রবহমান সময়টাকে নষ্টের প্রতিরোধ ও শুভর আগমনে যুযুধান রাখতে চাচ্ছে।
পরিশেষে একটি অত্যন্ত আশাপ্রদ বিষয় উল্লেখ করা দরকার, তা এই যে, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিন ও লিটলম্যাগকেন্দ্রিক লেখালেখি, সৃজনশীল ভাবনার কেন্দ্রগুলো এখন আর শুধুমাত্র বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বাইরে অপরাপর বাংলাভাষি অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম অঞ্চলেও এখানকার লিটলম্যাগ ও লিটলম্যাগের কবি-সম্পাদকগণ পরিচিত ও সমাদৃত হচ্ছেন। ওখানকার লিটলম্যাগের পাতায় এবং বাংলাদেশের লিটলম্যাগাজিনের পাতায়-পাতায় চোখ বুলোলে এর সত্যতা বোঝা যায়। সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যেদিন এইসব শ্রম-মেধা আর আন্তরিক সততার চিহ্নায়ক লিটলম্যাগগুলোর শাদা বুক চিরে ওঠে আসবে নতুনকালের বাংলাভাষার উপযোগী বলিষ্ঠ কবি, সাহিত্যব্রতীর কণ্ঠস্বর। একটি জাতি তার সৃজনপ্রয়াসী সন্তানদের কাছ থেকে যে-কণ্ঠস্বর শোনার জন্যে অধীর আগ্রহে উৎকর্ণ হয়ে থাকে যুগে যুগে।
wikipedia || Hafiz Rashid Khan
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে বেরিয়েছে-বের হচ্ছে ‘ইরুক’ (সম্পাদক : মৃত্তিকা চাকমা), ‘ক’জলি’ (সম্পাদক : সুসময় চাকমা ও সজীব চাকমা), ‘মাওরুম’ (সম্পাদক : দীপায়ন খীসা), ‘জুম’ (সম্পাদক : নবলেশ্বর দেওয়ান লায়ন, পল্লব চাকমা, জুয়েল চাকমা), ‘জ্বলি যার বুবর বুক’ (সম্পাদক : অনুস্মৃতি চাকমা), ‘টঙ’ (সম্পাদক : রনেল চাকমা), ‘হাজলং’ (সম্পাদক : স্মরণিকা চাকমা), ‘রেগা’ (সম্পাদক : ইন্টুমনি তালুকদার), সমুজ্জ্বল সুবাতাস (সম্পাদক : হাফিজ রশিদ খান ও চৌধুরী বাবুল বড়–য়া), ‘মা ত্রি চা লু মু খি পা খু ব ত’ (সম্পাদক : মুক্তা চাকমা), ‘মো লাং নীং’ (সম্পাদক : বো চ হাই), ‘মোনকধা’ (সম্পাদক : কীর্তিনিশান চাকমা), ‘হিলি ওয়েভস’ (সম্পাদক : সুবারুন চাকমা), ‘ইয়াপ্রি-তিন’ (মলয় কিশোর ত্রিপুরা), ‘স্ববন’ (সম্পাদক : মুকেশ চাকমা), ‘আপেং’ (সম্পাদক : রিপন চাঙমা), ‘রেঙ’ (সম্পাদক : লিটন চাকমা অন্নদা), ‘ত্যেঠা’ (সম্পাদক : উ রাখাইন কায়েস)। এসব সাময়িকপত্র ও ছোটো কাগজ প্রবহমান সময়টাকে নষ্টের প্রতিরোধ ও শুভর আগমনে যুযুধান রাখতে চাচ্ছে।
পরিশেষে একটি অত্যন্ত আশাপ্রদ বিষয় উল্লেখ করা দরকার, তা এই যে, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিন ও লিটলম্যাগকেন্দ্রিক লেখালেখি, সৃজনশীল ভাবনার কেন্দ্রগুলো এখন আর শুধুমাত্র বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বাইরে অপরাপর বাংলাভাষি অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম অঞ্চলেও এখানকার লিটলম্যাগ ও লিটলম্যাগের কবি-সম্পাদকগণ পরিচিত ও সমাদৃত হচ্ছেন। ওখানকার লিটলম্যাগের পাতায় এবং বাংলাদেশের লিটলম্যাগাজিনের পাতায়-পাতায় চোখ বুলোলে এর সত্যতা বোঝা যায়। সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যেদিন এইসব শ্রম-মেধা আর আন্তরিক সততার চিহ্নায়ক লিটলম্যাগগুলোর শাদা বুক চিরে ওঠে আসবে নতুনকালের বাংলাভাষার উপযোগী বলিষ্ঠ কবি, সাহিত্যব্রতীর কণ্ঠস্বর। একটি জাতি তার সৃজনপ্রয়াসী সন্তানদের কাছ থেকে যে-কণ্ঠস্বর শোনার জন্যে অধীর আগ্রহে উৎকর্ণ হয়ে থাকে যুগে যুগে।
wikipedia || Hafiz Rashid Khan



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন